বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৭

বাংলায় আন্ত:ধর্মীয় সম্পর্কের স্বরূপ



বাংলায় আন্ত:ধর্মীয় সম্পর্কের স্বরূপ
বাংলায় আন্ত:ধর্মীয় সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল।এটি পৃথিবীর অন্যতম উর্বর আর ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। সুদূর অতীতে এই অঞ্চল পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সম্পদশালী অঞ্চল ছিল।প্রতিটি গ্রাম স্বনির্ভর ছিল।এই কারণে সন্নিহিত অঞ্চলে পারষ্পরিক যোগাযোগের খুব একটা প্রয়োজন হতো না।ফলে এদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির প্রয়োজনীয় শর্তাদি অনুপস্থিত ছিল।অন্যদিকে অসংখ্য নদী দেশের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল;যা এখনও আছে। এই অবস্থা পারষ্পরিক যোগাযোগকে সীমায়িত করেছিল।যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা তাদের জীবনাচারে প্রভাব ফেলেছিল।ঐকালে    জলপথই ছিল   যোগাযোগের  প্রধান মাধ্যম।
প্রাচীন বাংলায় ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারষ্পরিক সম্পর্কঃ
 (ইসলামের আগমনের পূর্বে অত্র অঞ্চলের)বাংলার আদিম অধিবাসীদের বেশিরভাগ মানুষ প্রকৃতিপূজারী ছিল বলে অনুমান করা হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন তারা কোন ধর্মই অনুসরণ করতোনা।মহাস্থানগড় এবং উয়ারী বটেশ্বরে ভারতীয় আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে এদেশে নগর কেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠে। গ্রাম পর্যায়ে তখনও জনবসতি গড়ে উঠেনি।
 আর্যজাতি ভারতবর্ষে আধিপত্য বিস্তার করলে এই অঞ্চল অল্পসময়ের জন্য তাদের অধীনে  যায়।তারা অনার্যজাতির  জীবনাচারকে ভালভাবে নেয়নি এবং তাদের আধিপত্য বজায় রাখার প্রয়োজনও মনে করেনি।অন্যদিকে এই অঞ্চলের আবহাওয়া তাদের ভালও লাগেনি।তবে শশাংক (৭ম শতাব্দী) কিছুকাল বাংলার কিছু অংশ রাজত্ব করেন।তখন তারা বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার করেছিল।যেহেতু তারা বাংলার উত্তরের কিছু উঁচু অঞ্চল শসন করেছিল ফলে বাংলায় তখনও সনাতন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্ণভেদের আধিক্য অনুপস্থিত ছিল।
  বাংলা  ব্রাক্ষ্মণ  বা ক্ষত্রিয়ের বিচরণ ক্ষেত্র ছিলনা।ফলে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হলে বাংলার কিছু হিন্দু  বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে এবং এদেরই একটি অংশ বাংলার শাসনভার নেয়।এরা পাল বংশ হিসেবে খ্যাত। এই সময়ে বৌদ্ধধর্ম বাংলায় প্রভাব বিস্তার করেছিল কিন্তু সর্বত্রগামী হয়নি।এই সময়ে শাসক শ্রেণিকর্তৃক   সনাতন ধর্মীয় লোকেরা নির্যাতিত হয়েছিল বলে কেহ কেহ অভিযোগ করেন।কিন্তু এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হয়।তবে সেন বংশীয় রাজাগণ কর্তৃক বৌদ্ধধর্মাবলম্বীগণ নির্গৃহিত হয়েছেন।
মুসলিম বিজয় ও ধর্মীয় সম্পর্কঃ
 বাংলা অঞ্চলে মুসলিম বিজয়  বাংলায় আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।বাংলায় মুসলিম বিজেতারা কেহই ধর্মপ্রচারে নামেনি ;তবে শাসকদের প্রায় সবাই ধর্মপ্রচারক সূফি-দরবেশদের অনুরাগী ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদেরকে গুরুজন বলে মান্য করত।তারা আহবান করলে শাসকেরা সেনা পাঠাতে দ্বিধা করতো না।সুলতানি আমলের বিভিন্ন সময়ে নও মুসলিমরা আঞ্চলিক হিন্দু শাসককর্তৃক নির্যাতিত হত।এটা যতটা না ধর্মীয় ছিল  তার চাইতে বেশি ছিল ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন।এই সময়ে রাজা গৌর গোবিন্দ শেখ বোরহান উদ্দিনের সন্তানকে হত্যা করে। পরে হজরত শাহ জালালের সহায়তায় গৌর গোবিন্দ পরাজিত হয়। এই সময়েও হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের মাঝে সংঘাত ছিলনা।
সুলতানি আমলে শাসকজাতির দরবার দুই সম্প্রদায়ের মানুষের জ্ঞানীদের বিচরণক্ষেত্র ছিল।এই সময়ে বহু হিন্দুধর্মীয় পুস্তক বাংলা ভাষায় অনুদিত হয়।শাসকগোষ্ঠীর সম্প্রীতির উদাহরণ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে সর্বত্র সুসম্পর্কের পরিবেশ ছিল।
 এই সময়ের বহু মুসলিম কবির পুঁথিতে মুসলিম ধর্মীয় মিথের সাথে হিন্দু দেবদেবিও উপস্থিত থাকতো। এই আচরণ সেকালে স্বাভাবিক মনে করা হত।মুঘল আমলে  পারষ্পরিক  ধর্মীয়  সম্পর্ক উন্নত ছিল।
                            বর্ণভেদ   যেমন হিন্দুদের মধ্যে ছিল তেমনি আশরাফ-আতরাফ সমস্যা মুস্লিমদের মধ্যে ছিল ছিল।হিন্দু বা  মুসলিমের মধ্যে যারা অভিজাত শ্রেণির তারা অনুন্নত শ্রেণির সাথে দূরত্ব বজিয়ে চলত।একসাথে খেতোনা।হিন্দুদের বর্ণভেদ এখানেও বজায় ছিল।অনেকে মনে করেন উচ্চবর্ণীয় যারা ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিল তারা তাদের পূর্বেকার আভিজাত্য  আর বর্ণভেদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি।ইসলামের সাম্যের নীতি অভিজাতদের মধ্যে শিক্ষায় থাকেলেও চর্চায় ছিলনা।এইজন্য প্রাচীন মসজিদসমূহে দুটো ধাপ ছিল।
 নতুন ধর্মে দীক্ষিতদের অধিকাংশই হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল।তাদের পুরোনো ধর্মে ধর্মীয় বিধি- বিধান পালনের কড়াকড়ি  ছিলনা; তা ব্রাহ্মণদের জন্য নির্ধারিত ছিল।ফলে নতুন ধর্ম তাদের মোলিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আনলেও জীবনাচারে খুব একটা পরিবর্তন আনতে পারেনি।তারা হিন্দু ধর্মের অনেক আচারকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করত।তারা একদিকে যেমন মুসলিম সাধক-দরবেশ-সূফি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল অন্যদিকে শাসকদের ধর্ম গ্রহণ করে নিরাপত্তাও পেয়েছিল।
 সুলতানি -মুগোল ও বৃটিশ আমলে কখনো সাধারণ মানুষের অবস্থা উন্নত ছিল না।যারা শাসকদের অধীনে সরাসরি কাজ করতো তাদের অবস্থা ভাল ছিল।মুসলিম শাসকদের সরকারি ভাষা ছিল ফারসি।ফলে উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং ভাগ্য অন্বেষণে আসা মুসলিমরাই চাকুরী পেত।এসময়ে নব্য মুসলিমদের   অধিকাংশ মুসলিম ধর্মীয় বিধি-বিধান জানতো না এবং পালনও করতো না।আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তার একেবারেই সীমিত  ছিল।সূফিদের আস্তানাকে কেন্দ্র করে ইসলামী শিক্ষা আবর্তিত হত।বৃটিশ আমলেও গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনে অসমর্থ ছিল।তাদের মধ্যে অনেকেই লেংটি পরেই জীবন কাটিয়ে দিত।ফলে তাদের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল কিন্তু উম্মাদনা বা উন্মত্ততা ছিলনা।মুসলিম এবং হিন্দু দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে  মারামারি ছিল না।কারণ,সূফি দরবেশদের শিক্ষায় সহনশীলতা শিক্ষা দেয়া হত।

 ঢাকায় মোগল রাজধানী হওয়ার প্রায় অর্ধশতক আগে ঢাকা শহরে জর্ম্মাষ্টমীর মিছিল হত।ঐ মিছিলে প্রচুর মুসলিম দর্শক উপস্থিত হত।দর্শনার্থীদের মিষ্টি দেয়া হত

খ্রিস্টানদের সাথে সম্পর্কঃ

   ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ীদের সাথে কিছু খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক বাংলায় এসেছিল।ঐসব ধর্মপ্রচারকগণ এদেশীয় মানুষের সাথে সহজে মিশে যেতো। তাদের দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায়  এদেশীয় কিছু হিন্দু এবং পাহাড়ি আদিবাসী খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে বাংলায় খ্রিস্টান মিশনারিরা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমন করে।কিন্তু   ধর্মপ্রচারে  ব্রিটিশ সরকার মিশনারিদের সাহায্য করেনি।খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত্রা এবং মিশনারিদের সাথে মাঝে মাঝে মনের  অমিল হলেও মারামারি হয়নি।কারণ,তারা অধিকাংশই সেবার ব্রত নিয়ে এসেছিলেন।


হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত বৃটিশ আমলে শুরু হয়।ভাগকর আর শাসন কর  এই নীতির অংশ হিসেবে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু মুসলিম এই দুই সম্পদায়ের মধ্যে সংঘাতের সূত্র সৃষ্টি করে।এদেরই অগ্রগামী গোষ্ঠী হচ্ছে নব্য জমিদার শ্রেণি। জমিদার শ্রেণির অন্যায় অত্যাচার বেডে গেলে তা হিন্দু মুসলিম সম্পর্কে প্রভাব ফেলে।বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে  বিভেদে উস্কানি দেয়।মূলত: নব্য ধনিক শ্রেণির শোষণের মানষিকতা এর জন্য দায়ী। এই সময়ে বাংলাব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন  প্রসারিত হয়।ফলে ধনিক আর বুর্জুয়াদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠে।এরই সূত্র ধরে জমিদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মত ও আদর্শের  দল আন্দোলন চালায়। যেহেতু ঐ সকল জমিদার শ্রেণির অধিকাংশই ছিল হিন্দু তারা এবং তাদের মতাদর্শের ব্যক্তিগণই আক্রমনের শিকার হয়।কবি বেনজির আহমদও তার দলবল নিয়ে একবার জমিদার মদনমোহনের বাড়ি ডাকাতি করে এবং সফলও হয়েছিল।
 বাংলায় স্বাধিকার আন্দোলন গতি ফেলে তা ব্যর্থ করার জন্যও একটা গোষ্ঠী গোপনে প্রচেষ্টা চালায়। এরই অংশ হিসেবে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটায়। এসকল বিশৃঙ্খলায় যারা মেরেছে এবং মরেছে তারা কেহই অভিজাত নয়।
 নোয়াখালীর দাঙ্গা সেকালে বিশ্বব্যাপী প্রচার পায়।আসলে এটি ছিল   জমিদারদের পাইক পেয়াদার যুলুম আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে নির্যাতিতদের আক্রমন।অসংগঠিত গোষ্ঠী হওয়ায় তা নিরপরাধ হিন্দুদের বড় ধরনের ক্ষতি করে। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বহু নেতা কর্মী নোয়াখালীর স্থায়ী বাসিন্দা  ছিল।এইজন্য এই অঞ্চলে জমিদার বিরোধী মনোভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।যাই হোক এরকম সংঘাতমূখর অবস্থায় দুই সম্প্রদায়ের নেতাগণ ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্ত করে।অথচ তা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।বর্তমানে ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা পাকিস্তানের প্রায় সমান।
ধার্মিকতা ও ধর্মীয় সংঘাতঃ
    বাংলার মানুষ যখন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হল তখনই বাঙ্গলায় ধর্মীয় সংঘাত শুরু হয়। ধর্মের লেবাসে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলই তাদের ইচ্ছে ছিল।ফলে বিংশ শতাব্দী থেকে এই দ্বন্ধ শুরু হয় ;যা আজ অবধি আছে। আসলে ধার্মিক রুপধারী ব্যাক্তিগণই ধর্মীয় সংঘাতের জন্য দায়ী।


আন্তঃধর্মীয় বিয়ে

  বাংলা অঞ্চলে আন্তঃধর্মীয় বিয়ের প্রচলন ছিলনাপ্রাচীন বা আধুনিক কোন কালেই বাংলালিরা  একে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি
মুঘল শাসকদের বিয়েতে সম্পর্কে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক ছিলকিন্তু বাংগালিদের মধ্যে মাঝেমধ্যে এইরকম বিয়ে হততবে সেসব বিয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের মাঝেই দেখা যেতকবি কাজী নজরুল ইসলাম ,সংগীত শিল্পী ফিরোজা খাতুন অভিনেত্রী ফেরদৌসি মজুমদার আন্তঃধর্মীয় বিয়ের উদাহরণকবি কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দুদেরকে ঈশ্বরের কিতাবপ্রাপ্ত বলে বিশ্বাস করতেন ;এইজন্য হিন্দুধর্মীয়দের বিয়ে করা বৈধ মনে করতেনকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁদের জমিদারীতে (শিলাইদহে)মুসলিম ছেলে হিন্দু মেয়ের মধ্যে বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেনউচ্চশিক্ষিত সমাজেও এই বিয়েকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হয়নাবর্তমানেও এইরকম বিয়ে মাঝেমধ্যে হয়তখন  একপক্ষ ধর্মান্তরিত হয় ।

বর্তমানে
 ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীদের কারণে বহু যুবক বিপথগামী হচ্ছে এবং বিনা কারণে নীরিহ মানুষ ময়ারা পড়ছে। এই থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সময়ের দাবী।8/17/17


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Printfriendly

Featured Post

জাতি নির্মাণে গল্পযোগ

  জাতি নির্মাণে গল্পযোগ   ১ ।   মানুষ সামাজিক জীব।তারা পরিবার গঠন করে।তারপর সে-ই পরিবার একটি গোষ্ঠীতে রুপান্তরিত হয় এবং ধীরে ধীরে একাধিক গোষ...