শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আড্ডার দিনগুলো-২ (নাগরিক প্রসঙ্গ)

আড্ডার দিনগুলো-২

 (নাগরিক প্রসঙ্গ) 


একটি দেশের নাগরিক তাদের নাগরিক অধিকার ভোগ করবে,এটা প্রত্যাশিত। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নাগরিকের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখনই আমরা নাগরিকের শ্রেণিকরণ করা শুরু করি।কেউ প্রথম শ্রেণির নাগরিকবলে চিহ্নিত হই ,কেউ  দ্বিতীয় শ্রেণির, কেউবা তৃতীয় শ্রেণির।    

বিশ্বের যে সকল দেশে মানবাধিকার সমুন্নত আছে,সেখানে বাংলাদেশের মতো নাগরিক শ্রেণিকরণের বিষয় অনুপস্থিত।কর্মযজ্ঞে ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থান নিলেও অধিকারের ক্ষেত্রে অভিন্ন সুযোগ পেয়ে থাকে। 

প্রায় বছর পাঁচেক আগে দেশখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এ-ই বিষয়ে কিছু কথা বলেছিলেন।তিনি মনে করেন,বিদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বড় কাজ করা খুবই কঠিন।দেশে তাঁর বহু অনুরাগী রয়েছেন।আমি নিজেও তাকে ভালোবাসি। কিন্তু তাঁর উল্লিখিত মতের সাথে একমত হতে পারিনি। 


বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে,নাগরিক শ্রেণিকরণের অদৃশ্য প্রভাবে যোগ্য অনেকেই ধরাশায়ী।আমাদের মূখ্য আলোচক মনে করেন,জ্ঞানী,গুনী ও সাধক সব যুগেই সারা পৃথিবীর সম্পদ।তারা একই সাথে জাতীয়তাবাদী ও আন্তর্জাতিকতাবাদী।সত্য ও ন্যায়, দেশ ও কাল নিরপেক্ষ। তারা নিজ জন্মভূমিতে যখন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াইয়ে লড়তে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়,তখন তাদের হিজরত করা অনিবার্য হয়ে পড়ে।   

এবং একটি বাস্তবতা প্রতিটি শতাব্দীতে দেখা যায়,পৃথিবীতে মানুষের জন্য একটি আবাসস্থল থাকে , যেখানে মানুষ মুক্ত; মুক্ত থাকে স্বাধীন চিন্তা করায়,স্বাধীন থাকে নিজের বিশ্বাসকে লালন করায়।বর্তমানে এমন একটি অঞ্চল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র।ইউরোপকেও এ-র আওতায় রাখা যায়।  

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র যদি কাউকে নাগরিত্ব দেয় কিংবা আশ্রয় দেয়,তাহলে মাত্র দু' একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া সকল অধিকার ভোগ করার অধিকার দেয়।আমরা আমাদের নিজের জন্মভূমিতে যে সকল ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারিনা,তা আমেরিকায় ভোগ করতে সক্ষম।সুতরাং, সেখনে আশ্রয়প্রাপ্ত যে কেউ সেখানে যে কোন বিচারেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নয়।অথচ এখানে অগণিত অপবিত্র আত্মার সম্মিলনে আমাদের নাগরিক জীবন চারখার।ঘুষ-দুর্নীতি ,অনিয়মে দেশের সর্বস্তরের মানুষ ভুক্তভোগী।   


যে দেশে সত্যের পক্ষে থাকার জন্য,লড়াই করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র নৈতিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে,সেই দেশে নাগরিক শব্দটি অর্থহীন। যে-ই সুবিধা পায়,সে-ই নেয়; ন্যায়- অন্যায়ের বিচার উপেক্ষিত থেকে যায়।এখানে বিশ্বাসে ও কর্মে ভিন্নতা দৃশ্যমান হলে পেশিশক্তি দ্বারা সহজেই মানুষ আক্রান্ত হতে হয় এবং এজন্য আক্রান্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিচার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। 


বাংলাদেশের বহু বিজ্ঞানী, গবেষক বিদেশে গিয়ে তাদের জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রেখেছেন।অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও দেশে গবেষণা কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।এমন অনেক বাংলাদেশী প্রবাসী বিজ্ঞানী আছেন,যারা একটি সুযোগ চাচ্ছেন,প্রত্যাশা করছেন যাতে দেশে একটি চাকুরীর সুযোগ পেতে পারেন।কিন্তু অযোগ্যদের দাপটে তাদের আসবার পথ রুদ্ধ।অনেকে দেশে এসে খ্যাতি কুড়িয়েছেন;কিন্তু তাদের উদ্ভাবন কী, তা বরাবরই অপ্রকাশিত।অথচ তাদের খ্যাতির সীমা নেই।


সত্যিকার সাধক ও বিজ্ঞানীরা রাজনীতি নিয়ে মাথা খাটাবার সময় পাননা।শুধু শুধু তেল দেবারও চিন্তা করেন না।ফলে বিদেশে তাদের জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যান।জ্ঞানীদের দেশছাড়া হবার ইতিহাস নতুন নয়।আল-বেরুনী,ইবনে সীনা থেকে শুরু করে খ্যাতিমান অনেকের জীবনে এমনই ঘটেছে।কিন্তু তারা যেখানে গিয়েছেন সেখানেই সন্মানিত হয়েছে।আজ তারা সারা পৃথিবীর সম্পদ।

বাংলাদেশের  বহু চিকিৎসক দেশের সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে বেসরকারি হাসপাতালে পেশাগত জীবন কাটাচ্ছেন।তাদের অনেকেই অন্ধ আনুগত্য দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।যার ফলে ছিটকে পড়েছেন।এ-ই সরে যাওয়া তাদের জীবনকে বিষিয়ে দিয়েছে।কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অন্ধ আনুগত্য প্রত্যাশা করেনা।তারা শ্রম ও কর্মের মূল্য দেয়।এজন্য নিজ জন্মভূমিতে গবেষণা করতে ব্যর্থ হয়ে(হুমকির মুখে থাকে) তারা স্বাধীন জমিন খুঁজে নেয়।এই নতুন স্থান খুঁজে নেয়া বিশ্ববাসীর জন্য প্রয়োজন।এই স্বাধীন পরিবেশের যারা সষ্ট্রা ,তারা মত ও পথে ভিন্ন হলেও জ্ঞান বিজ্ঞানের পথে তারা সকলকে এক সারিতে এনে দেয়।যতদিন তারা তাদের এই নীতি বজায় রাখবে ,ততদিন পৃথিবী তাদের হাতের মুঠোয় থাকবে।  


 অপবিত্র মানুষের জঞ্জাল থেকে যতদিন আমরা মুক্ত হতে পারবোনা,ততদিন আমরা কেউ প্রথম,কেউ দ্বিতীয়,কেউ তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে।এটিই আমাদের নিয়তী।অন্যদিকে, অর্থের প্রবাহ ক্রমাগত আমাদের চরিত্র নষ্ট করে যাবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Printfriendly

Featured Post

জাতি নির্মাণে গল্পযোগ

  জাতি নির্মাণে গল্পযোগ   ১ ।   মানুষ সামাজিক জীব।তারা পরিবার গঠন করে।তারপর সে-ই পরিবার একটি গোষ্ঠীতে রুপান্তরিত হয় এবং ধীরে ধীরে একাধিক গোষ...